রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হুমকির মুখে পড়েছে ছাত্রলীগের প্রায় ৫০ হাজার নেতা-কর্মীর শিক্ষাজীবন। ছাত্রলীগের ওপর ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীদের বয়কট আর নিরাপত্তাহীনতার কারণে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন না তারা। এমন পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা অনলাইনমাধ্যমে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করতে চান। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্ট হওয়া সেশনজটের মধ্যে ক্লাস-পরীক্ষা দিতে না পারলে আরও সেশনজটে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা। অপরদিকে ছাত্রলীগের হামলার কারণে বিরোধী দলে থাকার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শতাধিক নেতা-কর্মী তাদের ছাত্রজীবন শেষ করতে পারেননি দাবি করেছে ছাত্রদল। তাই তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে বিচার চেয়েছেন।
ছাত্রলীগের একাধিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে প্রায় ৪০-৫০ জন নিয়মিত ছাত্র রয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা কমিটির সদস্যসংখ্যা ২৫১। ঢাবি শাখা ছাত্রলীগ (সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন ও সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত) কোনো হলেই কমিটি দিতে পারেনি। তবে পদপ্রত্যাশীরা তাদের হয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। ১৮ হলের সবগুলোতেই সক্রিয় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর সংখ্যা শতাধিক। ১৬ জুলাই আন্দোলনে হামলার পর তাদের অনেককেই হল ছাড়তে হয়। সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যা দুই হাজার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েও শতাধিক শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে ছাত্রলীগ করতেন। ছাত্রত্ব আছে এ রকম ছাত্রলীগ কর্মীর সংখ্যা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ জন। একই অবস্থা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও। জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যা ৫০০-এর বেশি। শাবিপ্রবি, যবিপ্রবি, হাবিপ্রবি, মাভিপ্রবি, কুবি, জাককানইবি, ববিসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০ থেকে ৩০০-এর ওপরে। এ ছাড়া সরকারি কলেজগুলোর প্রতিটিতে ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন। দেশে সরকারি কলেজের সংখ্যা ৭০১। তবে প্রকৃত সংখ্যার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম পান্থের মোবাইল নম্বরের সংযোগ পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও কোনো তথ্য দেননি। তবে ছাত্রলীগের সাবেক চারজন কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছয়জন নেতা এ সংখ্যা ৫০ হাজার হবে বলে দাবি করেছেন।
বয়কটে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের একাধিক ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তাদের হামলায় গত ১৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। আন্দোলনকারীদের কর্মসূচির পাল্টা হিসেবে ছাত্রলীগও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এ সময় আরও ছয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এরপর ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করায় শিক্ষার্থীরা হল ছাড়েন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হামলার পক্ষে ছাত্রলীগের অনেকে সমর্থন দেন। এসব ঘটনায় যারা সরাসরি অংশ নিয়েছেন, হামলা করেছেন তাদের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে বিভাগ থেকে সম্মিলিতভাবে বয়কট করা হচ্ছ। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ছবি দিয়ে ব্যানার-পোস্টারও করা হচ্ছে। আবার যাদের অপরাধ কম, তাদের শুধু ক্লাসের ক্ষেত্রে বয়কট করা হচ্ছে। কারও কারও জন্য পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। তবে সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ, সমুদ্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন, ফলিত গণিত, প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা একাধিক ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর ছবি দিয়ে ফটোকার্ড করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বয়কট করার ঘোষণা দিয়েছেন। এ কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগের এক কর্মী। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের একটি বিভাগের মাস্টার্সের এই ছাত্র বলেন, বিভাগ থেকে বয়কট করায় আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা তেমন সাড়া দেননি। আমরা অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে চাই। যেহেতু বৈষম্যবিরোধিতার কথা বলা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাজীবনের সঙ্গেও বৈষম্য না করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের একজন উপসম্পাদক বলেন, আমার মাস্টার্স চলছে। কিন্তু শেষ করতে পারব কি না জানি না। বিভাগ থেকে বয়কট করা হয়েছে। যাদের অপরাধ কম, তাদের ক্লাস করার সুযোগ দেয়ার পক্ষে শিক্ষার্থীদের বড় অংশ। কিন্তু কেউ কেউ বিরোধিতা করছে। তাই বিভাগের ছাত্র উপদেষ্টারা সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানতে পেরেছি। আরেকজন নেতা বলেন, যারা কোনো প্রকার অপরাধে জড়িত ছিল না তাদের ক্লাস, পরীক্ষায় অংশগ্রহণে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক যেন বাধা না দেন, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আনিসুর রহমান বলেন, এখানে দুটি বিষয়। যারা সরাসরি হামলা করেছে, তারা ফৌজদারি অপরাধ করেছে। তাদের বিচার হতে হবে। আর যারা কমিটিতে ছিল, সে ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বা যাদের অপরাধের ধরন লঘু তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে না মর্মে ক্ষমা চাইলে তাদের ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দিতে আপত্তি নেই। তবে ভিন্নমত পোষণ করেছেন মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের যারা নিজ সহপাঠীদের ওপর হামলা করেছে, তাদের সঙ্গে ক্লাস করা তো নিরাপদ না। তাদের বিচার হতে হবে। কিন্তু যারা অপরাধ করেনি, তাদের ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করা ঠিক হবে না।
ছাত্রদল নেতাদের ক্লাস-পরীক্ষা যেভাবে হয়েছিল : আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্লাস-পরীক্ষা দিতে এসে হামলার শিকার হন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। তাদের পরীক্ষা নেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে প্রক্টরিয়াল বডি-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয়। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের গেট বন্ধ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। সহকারী প্রক্টর, কর্মকর্তারা আলাদাভাবে দায়িত্ব পালন করতেন। অনেক সময় প্রক্টরের বাসায়ও পরীক্ষা নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এটি ২০১৩ সাল পর্যন্ত ছিল এবং সে ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না বলে দাবি করেছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। তিনি বলেন, আমাদের স্পষ্ট দাবি হচ্ছে, ছাত্রলীগের অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের বিচার হতে হবে। আইনি ও প্রশাসনিকভাবে তাদের বিচার করতেই হবে। এ সময় তিনি ছাত্রদলের তিন শতাধিক নেতা-কর্মী শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি বলে জানান।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

* কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফলে সেশনজটের পড়ার আশঙ্কা * ছাত্রলীগের ওপর ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা : বয়কটে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা
সংকটে ছাত্রলীগের ৫০ হাজার নেতা-কর্মীর শিক্ষাজীবন
- আপলোড সময় : ৩০-০৯-২০২৪ ১২:৩০:১৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩০-০৯-২০২৪ ১২:৩০:১৭ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ